শাহরিয়ার ইমনের অকাল মৃত্যু আমাদের সবাইকে মর্মাহত করেছে। তাঁর পরিবার, বন্ধু ও স্বজনদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাইপ্রাসে বসবাসরত বাংলাদেশিদের বর্তমান বাস্তবতা, চ্যালেঞ্জ এবং করণীয় নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই।

সাইপ্রাসে বর্তমানে কী হচ্ছে?

সাইপ্রাস দীর্ঘদিন ধরেই ইউরোপের অন্যতম শান্তিপূর্ণ ও কম অপরাধপ্রবণ দেশ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অপরাধের ঘটনা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর পেছনে বেশ কিছু জটিল সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ রয়েছে।

প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • অতিরিক্ত অভিবাসন ও অনিয়মিত মাইগ্রেশন
  • সীমিত কর্মসংস্থান
  • আবাসন সংকট
  • অর্থনীতির একটি নির্দিষ্ট খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা

সাইপ্রাস একটি ছোট দ্বীপ রাষ্ট্র। পর্যটন শিল্প এখানকার অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। কিন্তু কয়েক দশক ধরে একই খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অর্থনীতিকে সীমাবদ্ধ করে রেখেছে। অন্যদিকে, শিক্ষার্থী ভিসার মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক বিদেশি আসায় কাজ ও বাসস্থানের ওপর চাপ বেড়েছে। ফলে প্রতিযোগিতা, হতাশা এবং বিভিন্ন সামাজিক সমস্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে।

তাহলে কি শিক্ষার্থীরাই দায়ী?

ভিসা ব্যবসা, কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক মনোভাব, সরকারের সীমিত নজরদারি, দালালদের আকর্ষণীয় প্রচারণা এবং নিজ নিজ দেশের কর্মসংস্থানের সংকট—সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুল সংখ্যক নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় সাইপ্রাসে এসেছে।

একটি সমস্যার সঙ্গে যখন আরও অনেক সমস্যা যুক্ত হয়, তখন তার প্রভাব সমাজের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। সাইপ্রাসে অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত ছাত্রভিত্তিক মাইগ্রেশন তার একটি বাস্তব উদাহরণ।

যারা দীর্ঘদিন ধরে এখানে বসবাস বা কাজ করছেন, তারা এই বাস্তবতাকে সহজেই উপলব্ধি করতে পারবেন। মাত্র দুই-তিন বছর আগেও পরিস্থিতি এতটা জটিল ছিল না।

এর উত্তর সরল নয়। আংশিকভাবে হ্যাঁ, আবার আংশিকভাবে না।

হ্যাঁ, কারণ—

অনেকেই বিপুল অর্থ ব্যয় করে বিদেশে আসছেন, কিন্তু পর্যাপ্ত গবেষণা, বাস্তবতা যাচাই কিংবা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়াই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চাকচিক্য দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া, বাস্তব জীবন ও অনলাইন জীবনের পার্থক্য না বোঝা এবং নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে ব্যর্থ হওয়া অনেক ক্ষেত্রে সমস্যাকে বাড়িয়ে তোলে।

অনেকেই বিদেশে এসেও নিজেদের আচরণ, মানসিকতা বা সামাজিক অভ্যাসে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে পারেন না। এর ফলেও ব্যক্তিগত ও সামাজিক নানা জটিলতা তৈরি হয়।

না, কারণ—

আমরা এমন একটি দেশ থেকে এসেছি, যেখানে কর্মসংস্থানের সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্বল নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সীমিত সুযোগ-সুবিধা অনেক তরুণকে বিদেশমুখী হতে বাধ্য করে।

অনেক পরিবারের কাছে মাইগ্রেশনই উন্নত জীবনের একমাত্র সম্ভাব্য পথ। তাই এই শিক্ষার্থীদের সব দায় এককভাবে চাপিয়ে দেওয়া ন্যায়সঙ্গত হবে না।

বাস্তবতা হলো, আমাদের পাসপোর্টের গ্রহণযোগ্যতা বিশ্বজুড়ে আগের তুলনায় অনেক কমেছে। বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশিদের বিষয়ে বাড়তি সতর্কতা দেখা যায়। সাইপ্রাসেও ভবিষ্যতে অভিবাসন নীতিমালা আরও কঠোর হওয়ার সম্ভাবনা স্পষ্ট।

সাইপ্রাসের বাস্তবতা

সাইপ্রাসে কাজের বড় অংশই মৌসুমি। জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেশি। কিছু ক্ষেত্রে বৈষম্য ও বর্ণবাদের অভিজ্ঞতাও পাওয়া যায়। ফলে একজন সাধারণ অভিবাসীর জন্য এখানে টিকে থাকা সহজ নয়।

আজকের বিশ্বে প্রায় প্রতিটি দেশই অর্থনৈতিক, সামাজিক কিংবা রাজনৈতিক নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। অভিবাসীদের জীবনও দিন দিন আরও কঠিন হয়ে উঠছে। এর পেছনে রয়েছে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, অভিবাসন নীতি, স্থানীয় বাস্তবতা এবং দীর্ঘদিনের সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট।

বাংলাদেশিরা কেন বেশি ভুক্তভোগী?

সাইপ্রাসে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ আসার পর খাদ্য সরবরাহ (ফুড ডেলিভারি) খাতে কাজ শুরু করে, কারণ এটি তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য এবং বিশেষ দক্ষতা ছাড়াই করা যায়।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, রাস্তায় দীর্ঘ সময় কাজ করার কারণে তারা অনেক সময় কিশোর অপরাধীদের সহজ লক্ষ্যবস্তু হয়ে পড়ে। এসব ঘটনার পেছনে কখনও কিশোরসুলভ দুষ্টুমি, কখনও প্রভাব বিস্তারের মানসিকতা, আবার কখনও মাদকসংক্রান্ত বিষয়ও জড়িত থাকে।

অনেকে বলেন, আমাদের সমস্যার মূল কারণ কমিউনিটির অভাব। আমি বিষয়টি কিছুটা ভিন্নভাবে দেখি।

প্রবাসে কমিউনিটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শুধুমাত্র কমিউনিটি থাকলেই সব সমস্যার সমাধান হয় না। পশ্চিম ইউরোপের কিছু দেশে বাংলাদেশি কমিউনিটি শক্তিশালী কারণ সেখানে কয়েক প্রজন্ম ধরে মানুষ স্থায়ীভাবে বসবাস করছে। সাইপ্রাসের বাস্তবতা ভিন্ন।

আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দক্ষতার ঘাটতি।

অনেকেই পর্যাপ্ত ভাষাজ্ঞান, পেশাগত দক্ষতা বা সামাজিক প্রস্তুতি ছাড়াই বিদেশে আসেন। ফলে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে টিকে থাকা কঠিন হয়ে যায়। অন্যদিকে, যারা নিজেদের দক্ষতা উন্নত করেন, তারা তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে যেতে সক্ষম হন।

এর পাশাপাশি কিছু আচরণগত সমস্যাও রয়েছে—

  • স্থানীয় আইন ও নিয়মকানুন সম্পর্কে অজ্ঞতা
  • ট্রাফিক ও নাগরিক শৃঙ্খলা না মানা
  • উচ্চস্বরে দলবদ্ধ আড্ডা
  • অপ্রয়োজনীয় গ্রুপিং ও বিভাজন
  • সামান্য বিষয়ে অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব

বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের জীবনের বড় অংশ হয়ে গেছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে এটি বাস্তবতার চেয়ে কল্পনার জগত বেশি তৈরি করে।

বাংলাদেশি বিভিন্ন অনলাইন গ্রুপে প্রায়ই দেখা যায়, সাহায্যের চেয়ে তর্ক-বিতর্ক, অপমান বা ব্যক্তিগত আক্রমণ বেশি হচ্ছে। অনেকেই নিজের হতাশা ও ক্ষোভ অন্যের ওপর ঝেড়ে ফেলেন।

আরেকটি প্রবণতা হলো—সবাই এখন কনটেন্ট ক্রিয়েটর হতে চায়।

ক্যামেরার সামনে ইউরোপের সুন্দর জীবন তুলে ধরা হয়, কিন্তু এর পেছনের সংগ্রাম, পরিশ্রম, মানসিক চাপ বা বাস্তবতা খুব কমই দেখানো হয়।

এই বাস্তবতাকে অনেকটা শাহরুখ খানের Shah Rukh Khan অভিনীত Dunki সিনেমার সঙ্গে তুলনা করা যায়। সেখানে দেখা যায়, বিদেশে কঠিন জীবনযাপন করা মানুষও দেশে পরিবারের কাছে সাফল্যের ছবিটাই তুলে ধরে।

অনেক সময় যে ব্যক্তি সামাজিক মাধ্যমে বিলাসী জীবন দেখাচ্ছেন, বাস্তবে তিনিও হয়তো আরও কয়েকজনের সঙ্গে একটি ছোট রুমে থাকেন এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে জীবন চালিয়ে যাচ্ছেন।

প্রবাসের অধিকাংশ মানুষই কোনো না কোনো ধরনের শ্রমনির্ভর কাজের সঙ্গে যুক্ত। কাজের ধরন ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু পরিশ্রমের বাস্তবতা সবার জন্যই প্রায় একই।

করণীয় কী?

সবার আগে আমাদের নিজেদের পরিবর্তন করতে হবে।

শিক্ষার্থীদের প্রতি অনুরোধ—

স্থানীয় সংবাদমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় মন্তব্যযুদ্ধ থেকে দূরে থাকুন।

অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল হন।

ব্যক্তিগত আচরণ ও শিষ্টাচার উন্নত করুন।

ভাষা ও পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি করুন।

স্থানীয় আইন ও সংস্কৃতিকে সম্মান করুন।

অনলাইনের চাকচিক্যের চেয়ে বাস্তব জীবনের উন্নয়নে বেশি মনোযোগ দিন।

মনে রাখতে হবে, দক্ষতা কখনোই বৃথা যায় না। কাজ, যোগাযোগ, ক্যারিয়ার—সব ক্ষেত্রেই এটি আপনাকে এগিয়ে রাখবে।

নিজেকে অন্যের সঙ্গে তুলনা না করে নিজের উন্নয়নের দিকে মনোযোগ দিন। সামাজিক মাধ্যমে দেখা সবকিছু বাস্তব নয়। অনেক সময় একটি সুন্দর ছবি বা ভিডিওর পেছনে লুকিয়ে থাকে দীর্ঘ সংগ্রাম, ক্লান্তি এবং ত্যাগ।

এই দ্বীপ দেশে হতাশার গল্পের আরেকজন চরিত্র না হয়ে, নিজের জন্য সময় দিন, নিজের উন্নয়নে বিনিয়োগ করুন এবং ধৈর্য ধরে এগিয়ে যান।

খারাপ আচরণ, নেতিবাচক মানসিকতা এবং দক্ষতার অভাব কখনোই স্থায়ী সমাধান নয়। বরং এগুলো আরও হতাশা তৈরি করে।

সচেতনতা, শৃঙ্খলা, পারস্পরিক সম্মান এবং দক্ষতাই হতে পারে আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।

ধন্যবাদ। ❤️

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here