মানব পাচারবিরোধী কার্যক্রমে সাইপ্রাস আবারও শীর্ষস্থানে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ২০২৫ সালের Trafficking in Persons Report-এ দেশটি পরপর চতুর্থ বছর Tier 1 ক্যাটাগরিতে স্থান পেয়েছে।
এই রিপোর্টটি এপ্রিল ২০২৪ থেকে মার্চ ২০২৫ পর্যন্ত সময়কালকে অন্তর্ভুক্ত করে প্রকাশিত হয় সেপ্টেম্বর ২০২৫ সালে।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, সাইপ্রাস সরকার মানব পাচার প্রতিরোধে ধারাবাহিক ও কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে — যার মধ্যে রয়েছে অভিযান বৃদ্ধি, বিচার প্রক্রিয়া শক্তিশালীকরণ এবং ভুক্তভোগীদের সহায়তা সম্প্রসারণ।
⚖️ দখলকৃত উত্তর সাইপ্রাসে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ
রিপোর্টের বিপরীত চিত্র দেখা গেছে তুরস্ক-অধিকৃত উত্তর সাইপ্রাসে, যেখানে পাচার ও শোষণের চিত্র ভয়াবহ। রিপোর্টে বলা হয়েছে, উত্তরের নাইটক্লাবগুলো মূলত পতিতালয় হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে নারীদের জোরপূর্বক যৌন কাজে বাধ্য করা হয় এবং তথাকথিত প্রশাসন এ বিষয়ে চোখ বন্ধ করে আছে।
২০২৪ সালে একজন পাচারকারীও গ্রেপ্তার বা দণ্ডিত হয়নি, এমনকি কোনো ভুক্তভোগীকে সহায়তা বা সুরক্ষা দেওয়া হয়নি।
রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, তথাকথিত “উত্তর সাইপ্রাস তুর্কি প্রজাতন্ত্র (TRNC)” কেবলমাত্র তুরস্ক কর্তৃক স্বীকৃত, অন্য দেশগুলো এটিকে এখনো অধিকৃত অঞ্চল হিসেবেই দেখে।
👮♀️ সাইপ্রাসের উদ্যোগের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
১৭ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে Cyprus Stop Trafficking Organization আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে পুলিশ ইন্সপেক্টর এলেনি মাইকেল, যিনি মানব পাচারবিরোধী ইউনিটের প্রধান, রিপোর্টটি সাইপ্রাসের সাফল্যের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে Cyprus Stop Trafficking-এর নির্বাহী সভাপতি পারাসকেভি জেওউ শ্রম শোষণ নিয়ে বক্তব্য রাখেন, আর তুর্কি সাইপ্রিয়ট গবেষক মিনে ইউসেল উত্তর অংশের পরিস্থিতির বিস্তারিত বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন।
💼 সাইপ্রাসে কীভাবে মানব পাচার ঘটে
রিপোর্টে বলা হয়েছে, পাচারকারীরা সাধারণত দুর্বল নারী, মাদকাসক্ত ব্যক্তি ও প্রতিবন্ধীদের লক্ষ্যবস্তু করে।
মূল দিকগুলো হলো:
- যৌন শোষণ ঘটে ব্যক্তিগত ফ্ল্যাট, হোটেল, বার, ক্যাফে ও ম্যাসাজ পার্লারে।
- ২০২৪ সালে শনাক্ত ভুক্তভোগীদের মধ্যে ছিল রোমানিয়া, সোমালিয়া ও শ্রীলঙ্কার নাগরিকরা।
- পাচারকারীরা পূর্ব ইউরোপ, দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে নারী শ্রমিকদের আকর্ষণ করে ভুয়া চাকরির প্রলোভনে (যেমন বারমেইড, রিসেপশনিস্ট)।
- ভারত, নেপাল, ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কা থেকে আসা অভিবাসীরা প্রায়ই ঋণ-দাসত্বে (debt bondage) পড়ে, এবং পাসপোর্ট জব্দ করে তাদের জোরপূর্বক কাজ করানো হয়।
এছাড়া রোমা শিশু, অভিবাসী ও আশ্রয়প্রার্থীরা বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ — অনেকে জোরপূর্বক ভিক্ষাবৃত্তি বা শ্রম শোষণের শিকার হন।
🚨 দখলকৃত উত্তর অংশে মানব পাচারের চিত্র
উত্তর অংশে বিদ্যমান তথাকথিত “নাইটক্লাব আইন” কার্যত অকার্যকর।
রিপোর্ট অনুযায়ী —
“মার্চ ২০২৫-এ উত্তর অংশে ২৭টি নাইটক্লাবে ৯৮ জন নারী কর্মরত ছিলেন (২০২৩ সালে সংখ্যাটি ছিল ৭৪৩)। পর্যবেক্ষকরা জানিয়েছেন, এসব ক্লাব মূলত পতিতালয় হিসেবে চালানো হয় এবং নারীদের পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত করে তাদের জোরপূর্বক যৌন কাজে বাধ্য করা হয়।”
যদিও ২০২০ সাল থেকে পাচার অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত, তথাকথিত প্রশাসন এখনও কোনো মামলা তদন্ত বা বিচার করেনি এবং ভুক্তভোগীদের কোনো আশ্রয় বা সুরক্ষা সেবা দেয় না।
গবেষক মিনে ইউসেল জানান, উত্তর অংশে কোনো সমন্বয় কমিটি, আশ্রয়কেন্দ্র, হটলাইন বা ভুক্তভোগী রেফারেল সিস্টেম নেই, বরং পাচার-শিকার ব্যক্তিদের প্রায়ই দেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়, ফলে ৮০% পর্যন্ত ভুক্তভোগী সাহায্য চাইতে সাহস পান না।
💻 ডিজিটাল প্রতারণা ও নতুন কৌশল
পারাসকেভি জেওউ সতর্ক করে বলেন, মানব পাচারকারীরা এখন ডিজিটাল জগতে সক্রিয়, যেখানে ভুয়া অনলাইন চাকরির বিজ্ঞাপন ও বড় আয়ের প্রলোভন দিয়ে মানুষকে ফাঁদে ফেলা হচ্ছে।
অনেকে চাকরির আশায় দেশে এসে বিচ্ছিন্ন পরিবেশে, যোগাযোগহীন অবস্থায়, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, অস্থায়ী বা নমনীয় কর্মসংস্থান ব্যবস্থার অপব্যবহার করে পাচারকারীরা অনেক সময় দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অল্প বেতন, এবং কোনো আইনগত সুরক্ষা ছাড়াই মানুষকে শ্রমে বাধ্য করছে।
🧩 অভিবাসীদের জন্য সুরক্ষা বাড়ানোর আহ্বান
জেওউ আরও উল্লেখ করেন, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান নীতি চালু হলেও, আশ্রয়প্রার্থীরা এখনো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
ইউরোপ কাউন্সিলের GRETA (Group of Experts on Action against Trafficking in Human Beings) সংস্থা আহ্বান জানিয়েছে —
কৃষি, নির্মাণ, পর্যটন ও হোটেল খাতে কর্মরত অভিবাসীদের জন্য আইনি সুরক্ষা জোরদার করার।
📊 উপসংহার
সাইপ্রাস মানব পাচারবিরোধী লড়াইয়ে একটি আদর্শ উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে, যেখানে সরকার আইনি ব্যবস্থা, সচেতনতা ও ভুক্তভোগী সুরক্ষা — তিন ক্ষেত্রেই কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে।
তবে তুরস্ক-অধিকৃত উত্তর অংশে অবহেলা, অপরাধে জড়িত থাকা এবং দায়মুক্তি এখনো পাচার বন্ধের সবচেয়ে বড় অন্তরায় হিসেবে রয়ে গেছে।










