ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর মধ্যে পে-অ্যাজ-ইউ-গো মোবাইলের মতোই আরেকটি বিতর্কিত ইস্যু এখন আশ্রয়প্রার্থী স্থানান্তর। ইইউ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে দেখা দিয়েছে গুরুতর মতবিরোধ— কে কতজন আশ্রয়প্রার্থী গ্রহণ করবে, কিংবা আদৌ নেবে কি না তা নিয়েই চলছে টানাপোড়েন।

লুক্সেমবার্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে আশ্রয় ও অভিবাসনবিষয়ক আলোচনায় যোগ দেন ইইউভুক্ত দেশগুলোর অভিবাসন ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরা। তবে মূল আলোচনার বাইরেও সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে দায়িত্ব বণ্টন— কোন দেশ বেশি দায়িত্ব নেবে, আর কে নিতে রাজি নয়।

২০২৩ সালে অনুমোদিত আশ্রয় ও অভিবাসন আইন অনুযায়ী, ইইউ কমিশন নির্ধারণ করবে কোন দেশ বর্তমানে অভিবাসনের চাপে রয়েছে। এরপর অন্যান্য দেশ হয় সে দেশ থেকে কিছু আশ্রয়প্রার্থী নিজেদের দেশে স্থানান্তর করবে, নয়তো অর্থনৈতিক বা মানবসম্পদ সহায়তা দেবে। এই নীতি ২০২৫ সালের জুনের মধ্যে কার্যকর হওয়ার কথা।

তবে বেশ কয়েকটি দেশ আশ্রয়প্রার্থী গ্রহণে অনাগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং পরিবর্তে অর্থনৈতিক সহায়তা প্রদানে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে।

লুক্সেমবার্গ বৈঠকের সাইডলাইনে বেলজিয়ামের অভিবাসন মন্ত্রী আনালিন ফন বসুইট জানান, তাঁর দেশের আশ্রয়গ্রহণ সক্ষমতা ইতিমধ্যে পূর্ণ হওয়ায় তারা আর্থিক সহায়তার পথ বেছে নিচ্ছেন। একইভাবে ফিনল্যান্ডের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও স্পষ্ট করে বলেন, তাদের দেশ কোনোভাবেই অন্য দেশ থেকে নতুন আশ্রয়প্রার্থী নিতে পারবে না।

নেদারল্যান্ডস সরকারও একই নীতি অনুসরণ করছে— অভিবাসী না নিয়ে অর্থনৈতিক সহায়তা দেবে। সুইডেনের অভিবাসনমন্ত্রী জোহান ফোরসেল বলেন, “গত এক দশকে সুইডেন ইতিমধ্যেই বিপুল সংখ্যক আশ্রয়প্রার্থীকে জায়গা দিয়েছে; নতুন করে নেওয়ার মতো সক্ষমতা আমাদের নেই।”

এমন অবস্থায় ইইউর অভ্যন্তরে অনেক দেশই আশ্রয়প্রার্থী নেওয়ার পরিবর্তে টাকা বা সহায়তা পাঠানোয় বেশি আগ্রহী, যা ইইউর ঐক্য ও নীতিগত অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

এছাড়া আশ্রয় প্রদান সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত কোনো দেশকে বাধ্যতামূলকভাবে মানতে হবে কি না— এ নিয়েও এখনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি সদস্য রাষ্ট্রগুলো। ডেনমার্কের অভিবাসনমন্ত্রী রাসমোস স্টকলোন্ড জানান, তাঁর দেশ কমিশনের প্রস্তাবিত খসড়ায় পরিবর্তন চেয়েছে, কিন্তু সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য রয়ে গেছে।

ইইউর অভিবাসন বিষয়ক কমিশনার মাগনুস ব্রুনার বলেন, “এই প্রক্রিয়া পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে দেশগুলোর মধ্যে আগ্রহ ও সহযোগিতা দুটোই বাড়ছে।”

তবে ইউরোপিয়ান পলিসি সেন্টারের সিনিয়র বিশ্লেষক আলবার্তো হোর্স্ট নিডহার্ডট সতর্ক করে বলেছেন, আশ্রয় নীতি বাস্তবায়নে বিভক্তি ইইউর বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে। তাঁর মতে, “যদি সদস্য রাষ্ট্রগুলো যৌথ চুক্তি বাস্তবায়ন থেকে সরে দাঁড়ায়, তাহলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের আশ্রয় নীতির প্রতি আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”

তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, এমন পরিস্থিতি হলে শেঙ্গেন অঞ্চলে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ফের চালু হতে পারে এবং বহিঃসীমান্তে সিস্টেমেটিক পুশব্যাক (অভিবাসীদের জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো) বাড়তে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here