বুধবার সাইপ্রাসে এক ব্যতিক্রমী দিন কাটলো—প্রাকৃতিক দুর্যোগে কেঁপে উঠলো পুরো দ্বীপ। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত দুটি ভূমিকম্প আঘাত হানে, যার তীব্রতা রিক্টার স্কেলে ছিল ৫.৩, একইসাথে ভারী বৃষ্টি, ঝড় এবং আকস্মিক বন্যায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে দ্বীপটির বিভিন্ন এলাকা।

প্রথম ভূমিকম্পটি স্থানীয় সময় সকাল ১১টা ৩০ মিনিটের কিছু পর পাফোস জেলার আয়িয়া মারিনা এলাকায় আঘাত হানে। যদিও বড় কোনো কাঠামোগত ক্ষতি হয়নি, তবুও সতর্কতার অংশ হিসেবে মানুষ অফিস ও ঘরবাড়ি থেকে বাইরে বেরিয়ে আসে। আয়িয়া মারিনার স্থানীয় নেতা মারিওস স্টিলিয়ানু নিশ্চিত করেছেন যে এলাকা নিরাপদ রয়েছে এবং বৃদ্ধ বাসিন্দারা ভালো আছেন।

পাফোস জেলা গভর্নর চারালাম্বোস পিটোকোপিটিস জানিয়েছেন, ভূমিকম্পের ফলে পাফোস ও তসাদা গ্রামের মধ্যবর্তী রাস্তায় পাথর পড়েছে।

এদিকে, সাইপ্রাস টেলিকমিউনিকেশন কর্তৃপক্ষ (Cyta) জানিয়েছে, ভূমিকম্পের পরপরই নেটওয়ার্কে অস্বাভাবিক চাপ সৃষ্টি হওয়ায় কয়েক মিনিটের জন্য সংযোগে জট দেখা দেয়, তবে দুপুর ১টার মধ্যেই সেবা স্বাভাবিক হয়ে যায়।

সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র পানাইওতিস লিয়াসিদেস আলফা টিভিতে জানান, কোনো গুরুতর ক্ষতি বা আহতের খবর পাওয়া যায়নি, তবে কিছু ছোটখাটো ভূমিধস ঘটেছে। তিনি নাগরিকদের শান্ত থাকার, আতঙ্কিত না হওয়ার ও নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার পরামর্শ দেন।


🌧️ প্রবল বৃষ্টি ও বন্যা পরিস্থিতি

ভূমিকম্পের আতঙ্ক কাটতে না কাটতেই দুপুরে শুরু হয় প্রবল বর্ষণ। রাজধানী নিকোসিয়া, ট্রুডোস পর্বতমালা সংলগ্ন এলাকা ও আশপাশের গ্রামগুলোতে ভারী বৃষ্টি ও ঝড় আঘাত হানে।

বৃষ্টিতে রাজধানীর সড়কগুলোতে হঠাৎ বন্যা সৃষ্টি হয়, অনেক স্থানে পানি জমে যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। এনগোমি ও স্ত্রোভোলোস এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।

লাকাতামিয়া অঞ্চলে এক স্কুলবাস বন্যার পানিতে আটকা পড়ে, পরে দমকল বাহিনী শিশুদের নিরাপদে সরিয়ে নেয়। স্ত্রোভোলোসের এরিথ্রোস স্ত্রাভরোস স্ট্রিট ও আলেকজান্দ্রোপোলি স্ট্রিটে পুলিশ যান চলাচল বন্ধ করে দেয়।

দমকল বাহিনীর মুখপাত্র আন্দ্রেয়াস কেটিস জানান, দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ৬০টিরও বেশি কল আসে, বেশিরভাগই পানি নিষ্কাশন ও রাস্তায় জমে থাকা পানি সরানোর অনুরোধ ছিল।


🌍 দ্বিতীয় ভূমিকম্প ও বৈজ্ঞানিক মন্তব্য

দিনের শেষে বিকেল ৪টা ৩০ মিনিটের পর আরেকটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে—রিক্টার স্কেলে এর তীব্রতাও ছিল ৫.৩, কেন্দ্রস্থল ছিল আবারও পাফোস এলাকা।

ভূতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগের পরিচালক ক্রিস্টোডুলোস হাজিজিওরগিউ জানান, দ্বিতীয় ভূমিকম্পটি সামান্য দুর্বল হলেও সারাদিন ধরে ছোট ছোট কম্পন অব্যাহত ছিল। তিনি বলেন, “ঘটনাটি পর্যবেক্ষণের মধ্যে রয়েছে এবং রাতেও কম্পন অনুভূত হতে পারে।”

ইউরো-মেডিটেরানিয়ান ভূমিকম্প কেন্দ্র জানিয়েছে, বুধবার সারা দিনে সাইপ্রাসে ৩০টিরও বেশি কম্পন রেকর্ড করা হয়েছে, যার মধ্যে দুটি ছিল ৪ থেকে ৫ মাত্রার।

গ্রীসের ভূমিকম্প সংস্থা প্রধান এফথিমিওস লেক্কাস সতর্ক করে বলেছেন, আগামী ৪৮ ঘণ্টা সতর্ক থাকতে হবে, কারণ ভূত্বকের ফাটলগুলোর প্রকৃতি সবসময় জানা যায় না।

তিনি আরও জানান, আফ্রিকান ও আনাতোলিয়ান প্লেটের সংযোগস্থল ‘Cyprus Arc’ এলাকায় বড় ভূমিকম্পের সম্ভাবনা থাকে। “ইতিহাসে ৩৬৫ খ্রিষ্টাব্দে কুরিওনে ৮ মাত্রার এক ভয়াবহ ভূমিকম্পে দক্ষিণ সাইপ্রাস ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল,” বলেন তিনি।

তবে তার মতে, ৬ থেকে ৭ মাত্রার ভূমিকম্পের সম্ভাবনাই বাস্তবসম্মত, যেমনটি ঘটেছিল ১৯৯৬ সালের পাফোস ভূমিকম্পে, যেখানে দুজন নিহত হয়েছিলেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here